ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারান পটুয়াখালীর লিজা আক্তার। বিয়ের পর স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান। দুই সন্তানের ভবিষ্যতের আশায় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন বছর দুই আগে। কিন্তু চারবার হাতবদল ও অমানবিক নির্যাতনের যৌন শিকার হন তিনি। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরে আসেন। এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন তাকে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামে পাঠায়। বর্তমানে ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তায় তিনি।
ভাগ্য বদলের আশায় মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার রিজিয়া বেগম ছয় বছর আগে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেযান। কিন্তু সেখানে দীর্ঘ সময় কাজ করানো কম খাবার দেওয়া এবং নির্যাতনের শিকার হতেহয় । অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং প্রায় পাঁচ বছর তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিবার ভেবেছিলেন তিনি মারা গিয়েছিলেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার বিমানবন্দরে তাঁকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সহায়তায় ও পিবিআই-এর সহযোগিতায় তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং ১৩ দিন পর তিনি পরিবারের কাছে ফিরে যেতে সক্ষম হন। বর্তমানে তাকে মানসিক সুস্থতার জন্য চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
লিজা বা রিজিয়ার মতো নারীর সংখ্যা এখন অনেক। গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে নারী অভিবাসীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি হয়রানি ও নিপীড়নসহ নানা সংকট নিয়ে ফেরত এসেছেন অসংখ্য নারী। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি নারী বিদেশে কাজ করছেন। তবে তাদের মধ্যে কতোজন ফিরেছেন তার সঠিক তথ্য নেই। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরেই অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরে এসেছেন। এদের বেশিরভাগই নিপীড়নের নানা অভিযোগ করেছেন। এছাড়া অন্তত আটশ নারীর লাশ দেশে এসেছে। এর বাইরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০১২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৬ হাজারের বেশি নারী মানব পাচারের শিকার হয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে কাল ৮ মার্চ পালিত হবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য অধিকার ন্যায়বিচার উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক’। এর মানে দেশে থাকা নারীদের যেমন অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে তেমনি প্রবাসে থাকা নারীদেরও অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
১০ লাখ নারী বিদেশে, অধিকাংশই সৌদি আরবে:
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ১৯৯১ সাল থেকে নারী কর্মীরা বিদেশে যাওয়া শুরু করেন। তবে শুরুর দিকে বছরে মাত্র কয়েক হাজার নারী বিদেশে যেতেন এবং বিভিন্ন সময়ে সরকার সেটি বন্ধও করে দেয়। তবে ২০০৪ সাল থেকে নারীরা ধারাবাহিকভাবে বিদেশে যাওয়া শুরু করেন। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা প্রথমবারের মতো বছরে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। আর ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানোর জন্য চুক্তি হওয়ার পর এই সংখ্যা রাতারাতি বছরে লাখ পেরিয়ে যায়। করোনা মহামারির দুই বছর বাদ দিলে ২০১৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রতি বছর এক লাখের বেশি নারী বিদেশে গিয়েছেন।
এর মধ্যে ২০১৫ সালে এক লাখ তিন হাজার ৭১৮ জন, ২০১৬ সালে এক লাখ ১৮ হাজার ৮৮ জন, ২০১৭ সালে এক লাখ ২১ হাজার ৯২৫ জন, ২০১৮ সালে একলাখ এক হাজার ৬৯৫ জন, ২০১৯ সালে এক লাখ চার হাজার ৭৮৬ জন নারী বিদেশে গেছেন। করোনা মহামারি চলাকালে ২০২০ সালে ২১ হাজার ৯৩৪ জন এবং ২০২১ সালে ৮০ হাজার ১৪৩ জন নারী বিদেশে গেছেন। এরপর ২০২২ সালে বিদেশে নারী কর্মী গেছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৪৬৬ জন। তবে ২০২৩ সালে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭৬ হাজার ১০৮ জনে। ২০২৪ সালে তা আরও কমে ৬১ হাজার ১৫৮ জনে নেমে আসে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৩১৭ জন।
বাংলাদেশ থেকে যত নারী বিদেশে যান তাঁদের অধিকাংশই যান সৌদি আরবে এবং ২০১৫ সালের পর থেকে এই যাওয়া ত্বরান্বিত হয়। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর সৌদি আরবে পুরুষ কর্মী পাঠানো বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ বারবার এই শ্রমবাজার চালুর অনুরোধ জানালেও সৌদি আরব সাফ জানিয়ে দেয় বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মী দিতে হবে, নয়তো বাজার খুলবে না। এরপর ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবের শ্রম মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী আহমেদ আল ফাহাইদের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসে এবং নারী কর্মী পাঠানোর চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। গত এক দশকে প্রায় পাঁচ লাখ নারী সৌদি আরবে গিয়েছেন। এদের অনেকেই যেমন বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে নিজের ও পরিবারের ভাগ্য বদলেছেন তেমনি নিপীঘনের শিকার হয়েওে ফিরেছেন অনেকে।
সাত বছরেই দেশে ফিরেছেন অন্তত ৭০ হাজার:
বিদেশ থেকে কতজন বাংলাদেশি নারী দেশে ফেরত এসেছেন তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে গত সাত বছরেই অন্তত ৭০ হাজার নারী ফেরত এসেছেন। এর মধ্যে করোনা মহামারি চলাকালে শুধু ২০২০ সালেই ফি রেছেন ৪৯ হাজার ২২ জন। বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী শুধুমাত্র বন্দি বা ডিপোর্টি হিসেবে ২০১৯ সালে তিন হাজার ১৪৪ জন, ২০২১ সালে ১ হাজার ৮১১ জন, ২০২২ সালে ছয় হাজার ২৯ জন, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৯১৬ জন, ২০২৪ সালে তিন হাজার ৩৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে অন্তত ১ হাজার ৮৯১ জন দেশে ফিরেছেন। এর আগে ২০১৮ সালে ১ হাজার ৩৬৫ এবং ২০১৯ সালে অন্তত এক হাজার নারীর ফেরার তথ্য রয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী ২০২২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত এই চার বছরে শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকেই ১৫ হাজারেরও বেশি নারী দেশে ফিরে এসেছেন।
ফেরত আসাদের অভিযোগ নিপীড়নের:
দেশে ফেরা নারী গৃহকর্মীদের অধিকাংশই অভিযোগ করেছেন, সেখানে তাঁরা শারীরিক, মানসিক এবং যৌন নির্যাতনসহ ঠিকমতো খাবার না পাওয়া, চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত বেতন না পাওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের অধিক কাজে নিয়োজিত থাকাসহ নানা সংকটে পড়েছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক জানিয়েছে ফেরত আসা নারীদের মধ্যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেরা অন্তত ১২১ জন নারীকে তাঁরা সেবা দিয়েছেন। এর বাইরে নানা ধরনের নিপীড়নের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন হাজারো নারী।
সংসারে সচ্ছলতার আশায় কুড়িগ্রাম থেকে যাওয়া এক নারী গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে গিয়ে গৃহকর্তার ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পরে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আশ্রয় নেন রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসে। দুই মাস পর তিনি দেশে ফেরেন। সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা রংপুরের এক নারী জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারে অভাবের কারণেতিনি ২০১৫ সালের ২৫ জুন সৌদি আরবে যান। যেবাড়িতে কাজ করতেন সেখানে তাঁকে শারীরিক নির্যাতন করা হতো। বাইরে থেকে আসা পুরুষেরাও নির্যাতন করত। প্রতিবাদ করায় তাঁর গায়ে আগুন দেওয়া হয়।
যশোরের এক নারী জানান, যে বাসায় কাজ করতেন সেই বাসার গৃহকর্তা, তাঁর ছেলে এবং ছেলের বন্ধুরা তাঁকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করেছে। ঢাকার উত্তর বাড্ডার এক নারী জানিয়েছেন যে বাসায় তিনি কাজ করতেন, ওই
বাসার পুরুষেরা তাঁকে শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানি করত। প্রতিবাদ করলে তাঁর চুল টেনে টেনে তুলে ফেলা হতো। মানিকগঞ্জের এক নারী জানিয়েছেন, সৌদি আরবের বনি ইয়াসার এলাকায় কাজ করতেন তিনি। নির্যাতনের কারণে চারতলা বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন তিনি। পরে তাঁর আশ্রয় হয় হাসপাতালের আইসিইউতে। কুমিল্লার এক নারীকে নির্যাতন করে মাথা ফাটিয়ে দিলে ১৪টি সেলাই লাগে।
সুনামগঞ্জের হোসনে আরা উন্নত জীবনের আশায় সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। দেশে ফেরার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে বিভ্রান্ত ও অসংলগ্ন অবস্থায় পাওয়া যায়। তিনি নিজের নাম বা পরিবারের কোনো তথ্য জানাতে পারছিলেন না। ব্র্যাক মাইগ্রেশন টিম তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে সহায়তা প্রদান করে এবং পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
দিলরুবা আক্তার নামে গৃহকর্মীর কাজের প্রলোভনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে মানবপাচারের শিকার হন। সেখানে তাঁকে একটি ক্লাবে আটকে রেখে জোরপূর্বক যৌনপেশায় যুক্ত করা হয়। আট মাস ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও তিনি কোনো বেতন পাননি। পরে কৌশলে সেখান থেকে বের হলেও মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
নারায়ণগঞ্জের বিধবা সাহারা বেগম তাঁর ১৭ বছর বয়সী মেয়ে জান্নাতকে দুবাইয়ে পরিচ্ছন্নতার কাজের প্রলোভনে বিদেশে পাঠান। সেখানে গিয়ে জান্নাত নির্যাতন ও জোরপূর্বক শোষণের শিকার হয়। মেয়ের ফোন পেয়ে সাহারা বেগম থানায় অভিযোগ করেন এবং পরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েল ফেয়ার সেন্টারের সহায়তা নেন। অভিযুক্ত দালালদের গ্রেপ্তার করলেও নানা চাপের কারণে মামলাটি জটিল হয়ে পড়ে। বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং জান্নাত ন্যায়ের প্রত্যাশায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
নোয়াখালীর পহেলী আক্তার পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার আশায় বিদেশে কাজ করতে যান। তাঁকে দুবাইয়ের বিউটি পার্লারে চাকরির প্রলোভন দেখানো হলেও সেখানে পৌঁছে তাঁর পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাঁকে নাইটক্লাবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। অমানবিক নির্যাতনের মধ্যে প্রায় নয় মাস বন্দিদশায় থাকার পর পরিবারের উদ্যোগে ব্র্যাকের সহায়তায় তিনি দেশে ফিরতে সক্ষম হন। দেশে ফিরে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা করলে দুইজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলাটি বর্তমানে চলমান রয়েছে।
গাজীপুরের ইতি আক্তার দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সার্বিয়ায় ক্লিনারের কাজের প্রলোভনে পড়ে বিদেশে যান। দালালদের প্রতারণায় তিনি সেখানে একটি বাসায় আটকা পড়েন এবং চার মাস ধরে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। অবশেষে এক প্রতিবেশীর সহায়তায় তিনি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন এবং সার্বিয়ান প্রতিষ্ঠান। এনজিও এটিনা এর সহায়তায় উদ্ধার হন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের গভীর ক্ষত নিয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন শূন্য হাতে।
ফেরত আসা নারীরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও নির্যাতন সামলাতে না পেরে নারীরা নিয়মিত পালিয়ে দূতাবাসের সেফ হাউসে আশ্রয় নেন। সৌদি দূতাবাসের বিভিন্ন চিঠিতেও এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সৌদি আরবের সাবেক এক রাষ্ট্রদূত লিখেছিলেন। এ পর্যন্ত ৫৫ জন গৃহকর্মী অতিরিক্ত কাজের চাপ, দুর্ব্যবহার বা নির্যাতনের কারণে গৃহকর্তার বাড়ি থেকে পালিয়ে দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিদিনই তিন-চারজন গৃহকর্মী এভাবে আশ্রয় নিচ্ছে।’
আরেক চিঠিতে রাষ্ট্রদূত লেখেন, গৃহকর্মীদের মধ্যে ৫৬ জন দূতাবাসের সহায়তায় এবং ৫৫ জনকে রিয়াদের দুটি কোম্পানির সহায়তায় দেশে পাঠানো হয়েছে। যাঁরা আসছেন, তাঁদের অনেকেরই শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি নেই।
সৌদি গৃহকর্তাদের বিরুদ্ধেও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। ওই চিঠিতে নারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনে আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ বেশ কটি বিকল্প প্রস্তাব দেন তিনি।
২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট সৌদি আরব ফেরত ১১০ নারী গৃহকর্মীর ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয় ৩৫ শতাংশ নারী শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। ৪৪ শতাংশ নারীকে নিয়মিত বেতন দেওয়া হতো না। দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে মন্ত্রণালয় তাঁদের ফিরে আসার ১১টি কারণ চিহ্নিত করেছে। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয় ফেরত আসা নারী কর্মীদের মধ্যে ৩৮ জন শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৮ জন নিয়মিত বেতন-ভাতা পেতেন না। এছাড়া অন্তত ২৩ জনকে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না।
লাশ হয়ে ফিরেছেন অন্তত ৮০০ জন: প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারীর মরদেহ বাক্সবন্দী হয়ে দেশে ফিরেছে। এদের অধিকাংশের মৃত্যু সনদে উল্লেখ আছে আত্মহত্যা। পরিবারগুলো বলছে, প্রতিটি মৃত্যুতেই কোনও না কোনও কিন্তু আছে।
এই যেমন ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন বেগম। সৌদি থেকে কীভাবে মিশরে গিয়ে তিনি মারা গেলেন সেই রহস্যের সমাধান হয়নি। মিশরের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে জানানো হয়, ২৯ মে মিশরে ৫ তলা থেকে পড়ে মোসাম্মৎ বেগম নামে এক নারী গৃহকর্মী মৃত্যুবরণ করেন। বেগমের স্বামী আব্দুল আজিজ বলেন, বেশ কিছুদিন আগে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে জানতে পারেন, বেগম নামে এক নারী মিশরে মারা গেছেন। কিন্তু তার স্ত্রী সৌদি আরবে থাকায় তিনি বিষয়টিতে গুরুত্ব দেননি। এরপর মিশর থেকে যখন তাকে ফোন করা হলো, তখন বুঝতে পারেন তার স্ত্রী মিশরে মারা গেছেন।
২০১৭ সালের জুলাই মাসে সৌদি আরবে যান আবিরুন বেগম। পরে গৃহকর্তার বাসায় মারা যান তিনি। মৃত্যুর ৫১ দিন পর তার পরিবার এ খবর জানতে পারে। সৌদি আরব থেকে ফিরিয়ে আনা আবিরুনের মরদেহের সনদে মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয় হত্যা। আবিরুনের পরিবারের সদস্যরা জানান, তার নিয়োগকর্তা আবিরুনের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে তাকে মেরে ফেলেছে। এমনকি দুই বছরে কোনও বেতনও তাকে দেওয়া হয়নি। কিন্তু, এই ঘটনার কোনও বিচার হয়নি।
একইভাবে সৌদি আরবে নির্যাতনে নিহত নাজমার মরদেহ দেশে আসে মৃত্যুর ৫৩ দিন পরে। গত বছরের ২৪ অক্টোবর তার মরদেহ দেশে আসে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান নাজমা। হাসপাতালে ক্লিনারের চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাকে পাঠানো হলেও তাকে কাজ দেওয়া হয় বাসাবাড়িতে। সেখানে তাকে যৌন নির্যাতনসহ নানাভাবে নির্যাতন করা হতো। অমানসিক নির্যাতনে নাজমার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার স্বজনেরা।
সৌদি আরব থেকে ফেরা ফরিদপুরের সুফিয়া বেগম বলেন, অনেক সময় নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে অনেকে আত্মহত্যা করেন। অনেকে নিজেকে আহত করেন। নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে আমি নিজের গলায় নিজে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিলাম। অনেকেই এমন করে। বাধ্য হয়েই তারা আত্মহত্যা করে।
সংকট সমাধানে নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, নিপীড়নকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে:
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান জানান, বিদেশে গিয়ে কত নারী বিপদে পড়েছেন বা ফেরত এসেছেন কিংবা কী ধরনের নিপীড়ন হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা
বলা সম্ভব নয়। কারণ ভয় ও সামাজিক অপবাদের কারণে অনেকেই নির্যাতনের ঘটনা জানান না। তবে যেসব চিত্র উঠে আসে সেগুলোভয়াবহ।
শরিফুল হাসান জানান, বিদেশে যাওয়ার পর বাংলাদেশের নারীদের সঙ্গে কথা বলে নিপীড়নকে মোটা দাগে তিনটা ধরনে ভাগ করা যায়। প্রথমটি কাজ ও বেতন সংক্রান্ত। নারীদের একটা বড় অংশ অভিযোগ করেন-তিনি ওই দেশের খাবার পরিবেশ, আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না। ফলে সংকটরে মধ্যে থাকেন। বেতন ঠিকমতো পান না। একাধিক বাসায় কাজ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, ওই নারী শ্রমিক যখন মানি য়েচলতে পারেন না, ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না, তখন নিয়োগকর্তা তাঁকে শারীরিক নির্যাতন করেন। তৃতীয়ত, যে চিত্রটা আসে সেটা হলো যৌন নির্যাতনের ঘটনা। এই নিপীড়ন-নির্যাতন এতটাই বীভৎস, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যে নারীরা বিদেশে নিপীড়নের শিকার হয়েফিরে আসেন, তাঁদের পাশে অধিকাংশ সময় রাষ্ট্র থাকেনা।।
শরিফুল হাসান বলেন, অধিকাংশ সময় ট্রাভেল পাস দিয়ে একজন নারীকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ট্রাভেল পাস দেওয়ার আগে দূতাবাসকে ওই নারীর কথা শুনতে হবে এবং লিখিত অভিযোগ নিতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ঘটনাগুলো তদন্তের অনুরোধ করতে হবে যাতে নিপীড়নকারীরা শাস্তির আওতায় আসে। শরিফুল আরও বলেন, প্রায় আটশ নারীর লাশ এসেছে গত আট বছরে। বলা হয় এদের অনেকে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যেসব নারী বিদেশে কাজের জন্য যান তাঁরা দেশে মানসিক ও শারীরিকভাবে এতটাই ঝড়-ঝাপটা সহ্য করেন যে তাঁদের আত্মহত্যা করার কথা নয়। ফলে তাঁরা এমন কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে গেছেন যে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তারা মরদেহে শারীরিক নির্যাতনের চিহ্ন দেখেছেন।’
শরিফুল হাসান বলেন, গৃহকর্মীর বদলে নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্য কাজে পাঠাতে পারলে ভালো যেখানে সুরক্ষা আছে। তারপরেও সরকার যদি মনে করে নারীদের গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে বা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাবেই তাহলে পাঠানোর আগে তাঁদের বাছাই এবং প্রশিক্ষণটা যথাযথ করতে হবে। প্রত্যেক নারীর মোবাইল ফোন ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আর তাঁরা বিপদে পড়লে রাষ্ট্র দূতাবাস সবার পাশে থাকতে হবে।
শরিফুল হাসান আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফেরত আসা প্রায় দেড় হাজার নারীকে আমরা কাউন্স লিং প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তা দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। আমাদের অভিজ্ঞতায় বলতে হয় কাজটি সবাই মিলে করতে হবে। সবার আগে আমাদের একটি কর্মকৌশল (এসওপি) ও কাঠামো ঠিক করতে হবে যে সৌদি আরবে গিয়ে কেউ যদি নিপীড়িত হয়ে ফেরত আসে বিমানবন্দরে কার কী ভূমিকা হবে, কোন সংস্থা কী দায়িত্ব পালন করবে। সরকার কীভাবে তাঁদের পুনরেকত্রীকরণ করবে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা সবাই মিলেই কাজটি করতে হবে। কেবল নারী এবং গরিব ও অসহায় নারী বলে তাঁদের প্রতি কোনো ধরনের অবহেলে দেখানো যাবে না। আরেকটা বিষয়, প্রায়ই নারী নিপীড়নের ঘটনাগুলোকে সংখ্যায় সীমাবদ্ধ করা হয়। কিন্তু মানবাধিকার লঙ্ঘনের এত এত ঘটনা কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। কারণ প্রত্যেকে একজন মানুষ এবং বাংলাদেশের মানুষ। একজন নারীর কান্না মানে পুরো বাংলাদেশের কান্না।।